গোরাণ্ডি–কাসকুলি কি নতুন পাচামির পথে? বেআইনি পাথর খাদান–ক্রাশারের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত পরিবেশ, পথে নামল আদিবাসী সমাজ
নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল–বারাবনি -: আসানসোল–বারাবনি বিধানসভা কেন্দ্রের গোরাণ্ডি–কাসকুলি এলাকা বর্তমানে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এলাকাজুড়ে বেআইনি পাথর খাদান ও ক্রাশার মেশিনের লাগামছাড়া দৌরাত্ম্যে কার্যত ধ্বংসের মুখে জল, জঙ্গল ও জনজীবন। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে স্থানীয়দের মুখে মুখে গোরাণ্ডিকে এখন “আরেকটি পাচামি” বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি নিষ্ক্রিয়তায় ফুলেফেঁপে উঠছে পাথর মাফিয়া
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কথিত নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে পাথর মাফিয়ারা প্রকাশ্যেই বেআইনি খনন চালিয়ে যাচ্ছে। কোনও বৈধ অনুমতি ছাড়াই প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে, যার ফলে রাজ্য সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বেআইনি খাদানের বিরুদ্ধে পথে আদিবাসী সমাজ
এই বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এবার সংগঠিতভাবে পথে নেমেছে আদিবাসী সমাজ। ভারত জাকাত মাঝি পরগনা মহল-এর ব্যানারে আদিবাসীরা পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে অবিলম্বে বেআইনি পাথর খাদান ও ক্রাশার মেশিন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
জঙ্গল উজাড়, গাছ কেটে ধ্বংস পরিবেশ
আদিবাসী সমাজের অভিযোগ, গোরাণ্ডি এলাকায় কোনও বৈধ ছাড়পত্র ছাড়াই পাথর খাদান ও ক্রাশার চালানো হচ্ছে। এর জন্য নির্বিচারে জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে হাজার হাজার গাছপালা। স্থানীয় মানুষদের সামান্য টাকার লোভ দেখিয়ে এই বেআইনি খননে যুক্ত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ।
জঙ্গলে মজুত বিস্ফোরক, আতঙ্কে গোটা এলাকা
স্মারকলিপিতে আরও জানানো হয়েছে, এই খাদান ও ক্রাশারগুলির কাছে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অনুমতি নেই, এমনকি রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের কোনও বৈধ খনন ছাড়পত্রও নেই। তা সত্ত্বেও বিস্ফোরক ব্যবহার করে জোরালো বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাথর ভাঙা হচ্ছে।
অভিযোগ, জঙ্গলের বিভিন্ন অংশে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরণের জেরে গোটা এলাকা কেঁপে উঠছে, আশপাশের বাড়ির দেওয়ালে ফাটল ধরছে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
“জঙ্গল আমাদের দেবতা” — আদিবাসী সমাজের হুঁশিয়ারি
ভারত জাকাত মাঝি পরগনা মহলের সদস্য স্বপন মুর্মু বলেন,
“আদিবাসী সমাজ যুগ যুগ ধরে জল, জঙ্গল ও জমি রক্ষা করে এসেছে। জঙ্গল আমাদের কাছে দেবতুল্য। সবুজই আমাদের জীবন। বেআইনি ভাবে যদি জঙ্গল ধ্বংস করা হয়, তাহলে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই চলবে।”
ধুলো-দূষণে অসুস্থ শিশু ও বয়স্করা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্রাশার মেশিন থেকে উড়ে আসা ধুলোয় এলাকায় বসবাস কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বাড়ির ছাদ, জামাকাপড়, খাবারদাবার ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
নিয়ম কী বলছে, বাস্তবে কী হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ডিসিআর ব্যবস্থায় খনি মালিকরা মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ফি দিয়ে খনন চালাতেন। নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়ায় ২০১৬ সালে রাজ্য সরকার নতুন খনন নীতি চালু করে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী—
সরকারি জমির পাথর সরকার নিজেই নিলাম করবে
ব্যক্তিগত জমিতে খননের জন্য সাড়ে সাত বিঘা জমি ও পাঁচ বছরের অনুমতি বাধ্যতামূলক
জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও বন দপ্তরের ছাড়পত্র আবশ্যিক
কিন্তু অভিযোগ, গোরাণ্ডিতে খননকারীরা কেবল জমি সংক্রান্ত কিছু নথি দেখিয়ে অনুমতি আদায় করেছে। প্রয়োজনীয় দপ্তরের অনুমোদন না নিয়েই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিস্ফোরকের নিরাপত্তা কার দায়িত্বে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন উঠছে—জঙ্গলে মজুত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক কার নিরাপত্তায় রয়েছে? এই বিস্ফোরক যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে আসানসোল শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা বড়সড় বিপদের মুখে পড়তে পারে।
নজর জেলা প্রশাসনের দিকে
এখন সাধারণ মানুষ থেকে আদিবাসী সমাজ—সবার নজর জেলা প্রশাসনের দিকে। এই গুরুতর অভিযোগ নিয়ে প্রশাসন কবে এবং কী ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেটাই দেখার।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
January 30, 2026
Rating:

No comments: