নিজস্ব সংবাদদাতা, রানীগঞ্জ/বাঁকুড়া -: বাঁকুড়ার এক আশাকর্মীর আকস্মিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আশাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। মঙ্গলবার সেই প্রতিবাদের ঢেউ পৌঁছায় পশ্চিম বর্ধমানের রানীগঞ্জেও। রানীগঞ্জ ব্লকের আশাকর্মীরা বিডিও অফিস ও বিএমওএইচ দপ্তরের সামনে এক মিনিট নীরবতা পালন করে মৃত সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কাজের চাপ কমানো, মৃতের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরির বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন।
কয়েক দিন আগে বাঁকুড়ার শালতোড়া এলাকায় কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়া চলাকালীন একটি ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। অভিযোগ, প্রযুক্তিগত সমস্যা ও চাষের মরসুমের কারণে কয়েকজন আশাকর্মী গ্রামবাসীদের নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে কাজ করছিলেন। সেই সময় শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরি সেখানে গিয়ে আশাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁর কিছু মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে ওই ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এরপর সোমবার সকালে গঙ্গাজলঘাটির গোপীনাথপুর এলাকার আশাকর্মী রুম্পা মণ্ডল কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতির সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিনি সম্ভবত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁকে অমরকানন গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
রুম্পা মণ্ডলের মৃত্যুর পর সহকর্মী আশাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে মানসিক চাপের কারণে তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। যদিও এই অভিযোগের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি বা চিকিৎসাগত নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই অমরকানন গ্রামীণ হাসপাতালে বিক্ষোভে সামিল হন বহু আশাকর্মী। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল— অতিরিক্ত কাজের চাপ কমানো, আয়ুষ্মান ভারতের অতিরিক্ত দায়িত্ব পুনর্বিবেচনা করা এবং বিধায়কের মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং পরে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জেলাশাসক অনীশ দাশগুপ্ত, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শ্যামল সোরেন, মহকুমাশাসক-সহ প্রশাসনের একাধিক আধিকারিক হাসপাতালে পৌঁছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরিও বৈঠকে যোগ দেন। দীর্ঘ আলোচনা হলেও আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবিতে অনড় থাকায় বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনও সমাধান মেলেনি।
এদিকে মঙ্গলবার রানীগঞ্জ ব্লকের আশাকর্মীরাও একই দাবিতে প্রতিবাদে সামিল হন। রানীগঞ্জ ব্লকের আশাকর্মী ঝিলিক মণ্ডল বলেন, "আমাদের উপর ক্রমাগত নতুন নতুন কাজের দায়িত্ব চাপানো হচ্ছে। আমরা চাই কাজের সুষ্ঠু বণ্টন হোক এবং মৃত সহকর্মীর পরিবারের পাশে সরকার দাঁড়াক।"
তবে আন্দোলনকারীরা জানান, আপাতত তাঁরা কোনও সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেননি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা ভেবেই তিনি নিয়ম মেনে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, তাঁর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং কোনও অনভিপ্রেত ঘটনার সঙ্গে তাঁর মন্তব্যের যোগ রয়েছে— এমন অভিযোগ তিনি মানেন না।
বর্তমানে ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহল, স্বাস্থ্যকর্মী সংগঠন এবং প্রশাসনিক স্তরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সকলের।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
August 04, 2026
Rating:


No comments: