নিজস্ব সংবাদদাতা, কাঁকসা -: পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসা ব্লকের বনকাটি পঞ্চায়েতের অযোধ্যা গ্রামে আজও ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে রথযাত্রার সময়। কয়েকশো বছরের প্রাচীন পিতলের রথকে ঘিরে প্রতি বছর বসে বিশাল উৎসবের আসর। বিশেষ করে উল্টো রথের দিন গ্রামজুড়ে নেমে আসে উৎসবের আবহ, যেখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
বাংলার অন্যতম প্রাচীন ও বিরল ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে পরিচিত এই বিশাল পিতলের রথ শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক নয়, এটি ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল। রথের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকার্যে ফুটে উঠেছে চার যুগের নানা পৌরাণিক কাহিনি। সমুদ্র মন্থন, রাম-রাবণের যুদ্ধ, বিভিন্ন পৌরাণিক দৃশ্যের পাশাপাশি বাংলা সহজপাঠের চিত্র এবং জিমন্যাস্টিকের নানা ভঙ্গিমাও খোদাই করা রয়েছে রথের গায়ে। নবরত্ন মন্দিরের আদলে নির্মিত এই রথ শিল্পকুশলতার এক অসাধারণ নিদর্শন বলে মনে করেন ইতিহাসপ্রেমীরা।
স্থানীয়দের মতে, একসময় অযোধ্যা গ্রামে বসবাস করতেন বর্ধিষ্ণু মুখার্জি পরিবার। তাঁদের উদ্যোগেই এই রথযাত্রার সূচনা। লাক্ষা ও গালার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পরিবারের সদস্যরা, যার মূল কেন্দ্র ছিল বীরভূমের ইলামবাজার। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, ব্যবসার এক দিনের সম্পূর্ণ লাভের অর্থ ব্যয় করেই নির্মাণ করা হয় এই বিশাল পিতলের রথ। সেই রথেই আজও শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব মাসির বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেন।
তবে এত ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও রথটির নির্মাতা সম্পর্কে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য আজও জানা যায়নি। তবুও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই রথ কাঁকসার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে।
অযোধ্যা গ্রামে একাধিক প্রাচীন মন্দির থাকলেও রথযাত্রাই এখানকার প্রধান আকর্ষণ। রথযাত্রা ও উল্টো রথের দিন আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও বহু মানুষ এই ঐতিহাসিক রথের দর্শনে ভিড় জমান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে থাকে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থাও।
উৎসব শেষ হলে ঐতিহ্যবাহী এই পিতলের রথটি সংরক্ষিত থাকে মুখার্জি পরিবারের বাড়ির চত্বরে। একসময়ের রাজপ্রাসাদের মতো ঐশ্বর্যশালী সেই বাড়িটি আজ অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও, তার বুকেই আজও অমলিন হয়ে রয়েছে বাংলার ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য সাক্ষী—অযোধ্যার শতাব্দীপ্রাচীন পিতলের রথ।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
July 15, 2026
Rating:
.jpg)

No comments: