নিজস্ব সংবাদদাতা, আসানসোল -: উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ বন্ধ, জমির অধিকার সুরক্ষা, ভুয়ো তফসিলি উপজাতি (এসটি) শংসাপত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আসানসোলে আদিবাসী ছাত্রাবাস-সহ মোট ২২ দফা দাবিতে সরব হল অল আদিবাসী কো-অর্ডিনেশন কমিটি (আসানসোল-দুর্গাপুর)। বুধবার সংগঠনের উদ্যোগে আসানসোলের বি.এন.আর মোড় থেকে মহকুমাশাসকের দপ্তর পর্যন্ত গণমিছিল করে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আদিবাসী মহিলা, পুরুষ ও ছাত্রছাত্রীরা মিছিলে অংশ নেন। ধামসা-মাদলের তালে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে এবং হাতে নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রতীক ও ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র নিয়ে মিছিল এগিয়ে যায়। বিভিন্ন দাবির সমর্থনে স্লোগানও ওঠে। মিছিলকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার জন্য পুলিশি নিরাপত্তা ছিল কড়া।
সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী, ২২ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয় হল জমি ও উচ্ছেদ। সংগঠনের অভিযোগ, ওপেন কাস্ট প্রজেক্ট (ওসিপি)-সহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে পশ্চিম বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের জমি ও বসতভিটা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই অভিযোগ তোলা হয়েছে রেল ও স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (সেল)-এর উন্নয়নমূলক কাজ নিয়েও। সংগঠনের দাবি, উন্নয়নের প্রয়োজন থাকলেও তার জন্য আদিবাসীদের অধিকার ও অস্তিত্বকে উপেক্ষা করা যাবে না।
সংগঠনের কর্মী হীরালাল সরেন বলেন, ‘‘উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের অবৈধভাবে উচ্ছেদ করা চলবে না। পুনর্বাসনের নামেও তাঁদের নিজস্ব জমি ও অস্তিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।’’ তাঁর আরও দাবি, ভুয়ো এসটি শংসাপত্রের কারণে প্রকৃত আদিবাসীরা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রকৃত এসটি শংসাপত্র পেতেও তাঁদের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আসানসোলে আদিবাসী ছাত্রাবাসের দাবিও এদিন ফের সামনে আনে সংগঠনটি। হীরালাল সরেনের দাবি, ২০০৪ সাল থেকেই আসানসোল এলাকায় আদিবাসী ছাত্রাবাসের জন্য আবেদন জানানো হলেও এখনও পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ হয়নি।
এদিনের কর্মসূচিতে এসআইআর নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংগঠনের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বহু আদিবাসীর নাম বাদ পড়েছে। যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের পুনরায় ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি আদিবাসী সমাজের মধ্যে একাধিক ছোট-বড় সংগঠন গড়ে ওঠা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংগঠনের নেতৃত্ব। তাঁদের বক্তব্য, সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সমাজের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে কি না, সেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এই দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামতও রয়েছে বলে মনে করছে সংগঠন।
অন্যদিকে, সংগঠনের নেতা মতিলাল সরেনের অভিযোগ, প্রায় ২২ দিন আগে প্রশাসনকে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচির কথা জানানো হয়েছিল। বুধবার তাঁরা মহকুমাশাসকের দপ্তরে পৌঁছনোর পর জানতে পারেন, মহকুমাশাসক জরুরি বৈঠকে ব্যস্ত রয়েছেন। প্রশাসনের তরফে দ্বিতীয় আধিকারিকের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও সংগঠনের প্রতিনিধিরা মহকুমাশাসকের হাতেই দাবি-পত্র তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। কয়েক ঘণ্টা পর মহকুমাশাসক দপ্তরে ফিরলে তাঁর হাতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
মতিলাল সরেন আরও অভিযোগ করেন, আদিবাসীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রশাসনের কাছে বারবার জানানো হলেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য, ‘‘উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের নামে যদি আদিবাসীদের জমি থেকে সরানোর চেষ্টা চলতে থাকে, তাহলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হব।’’
এদিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের জমি, অধিকার, শিক্ষা, ভোটাধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো একাধিক বিষয়কে সামনে আনে সংগঠনটি। ২২ দফা দাবির স্মারকলিপি প্রশাসনের মাধ্যমে রাজ্য সরকারের কাছে পৌঁছনোর পর এখন দাবিগুলির বিষয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
September 30, 2026
Rating:

No comments: