নিজস্ব সংবাদদাতা, জামুড়িয়া -: আদিবাসী সমাজের প্রাচীন রীতি-নীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যকে সামনে রেখে পশ্চিম বর্ধমান জেলার জামুড়িয়া থানার অন্তর্গত দামোদরপুর আদিবাসী এলাকায় অনুষ্ঠিত হল ঐতিহ্যবাহী ছাতা মেলা ও পুজো। রবিবার সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণ ঘিরে শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। দিনভর পুজো-অর্চনা, সামাজিক রীতিনীতি, ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান এবং নানা ধরনের লোকজ সামগ্রীর সমাহারে উৎসবের চেহারা নেয় গোটা এলাকা। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণে ছিল মানুষের ভিড়।
আদিবাসী সমাজের কাছে ছাতা মেলা শুধুমাত্র একটি মেলা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসবে নিজেদের রীতি ও নিয়ম মেনে পুজো-অর্চনার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও কুটুমদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সুযোগ পান মানুষজন। ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান এবং লোকসংস্কৃতির নানা পরিবেশনার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছেও নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়।
এদিন মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু। আদিবাসী রীতি মেনে তাঁকে বরণ করে নেওয়া হয়। মেলার তাৎপর্য ও আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উপস্থিত মানুষের সামনে বক্তব্য রাখেন মন্ত্রী।
পরে প্রদীপ জ্বালিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন বারাবনির বিধায়ক অরিজিৎ রায়, বিজেপির জেলা সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্য, সুশীল টুডু, সুকু মাঝি-সহ সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীরা। মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী ও লোকজ পণ্যের দোকান বসেছিল। মেলায় আসা মানুষজন সেগুলি ঘুরে দেখার পাশাপাশি পছন্দের সামগ্রীও কেনাকাটা করেন।
দামোদরপুর ছাতা মেলা কমিটির পক্ষ থেকে এদিন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর হাতে কয়েক দফা দাবিদাওয়া সম্বলিত একটি স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী জানান, আদিবাসী সমাজের উন্নয়নের জন্য একাধিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রসারে হস্টেল ও বিদ্যালয় সংক্রান্ত উদ্যোগের পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থার কথাও তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য, পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় লাগলেও ধাপে ধাপে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
জামুড়িয়া বিধানসভা এলাকায় খোলামুখ কয়লা খনি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদের অভিযোগ নিয়েও মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তিনি জানান, এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত তাঁর কাছে লিখিত অভিযোগ আসেনি। লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হলে তা খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলাশাসককে বিষয়টি জানানোর পরামর্শ দেন মন্ত্রী।
এদিকে, মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও অতিথিদের উপস্থিতি থাকলেও জামুড়িয়ার বিধায়ক বিজন মুখার্জিকে অনুষ্ঠানের শুরুতে দেখা না যাওয়ায় উপস্থিত কয়েকজনের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। যদিও মেলা কমিটির সম্পাদক মহাশয় সরেন বিষয়টি নিয়ে জানান, বিধায়ককে মেলা কমিটির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কোনও কারণে তিনি নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হতে পারেননি বলে তাঁদের জানা গিয়েছে এবং পরে আসার কথা রয়েছে।
ছাতা মেলার সামাজিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহাশয় সরেন বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই পুজো ও মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই বর্তমান প্রজন্মও উৎসবটি পালন করছে। তাঁর কথায়, এই মেলা শুধু আনন্দ-উৎসবের ক্ষেত্র নয়, সামাজিক যোগাযোগ ও আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পাশাপাশি বিবাহযোগ্য ছেলে-মেয়েদের পরিবারগুলির মধ্যে পরিচয় ও দেখাশোনার ক্ষেত্র হিসেবেও এই মেলার একটি সামাজিক ভূমিকা রয়েছে।
সব মিলিয়ে দামোদরপুরের ছাতা মেলা এদিন হয়ে উঠল আদিবাসী লোকসংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক মিলনমঞ্চ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও নিজেদের প্রাচীন সংস্কৃতিকে ধরে রাখার এই উদ্যোগে মেলা প্রাঙ্গণে ফুটে উঠল গ্রামীণ আদিবাসী জীবনের নিজস্ব রং ও আবেগ।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
September 21, 2026
Rating:




No comments: