বালির দামে লাগাম, ১২০০ টাকার বেশি নিলেই ব্যবস্থা সিন্ডিকেটে কড়া প্রশাসন, অনিয়মে লিজ বাতিলের হুঁশিয়ারি
সত্যনারায়ণ সিং/যীশু হেমব্রম,আসানসোল -: বালির দামে লাগাম টানতে এবার কড়া পদক্ষেপের পথে জেলা প্রশাসন। পশ্চিম বর্ধমানে বৈধ বালি ঘাট থেকে ট্রাক্টরে বালি তোলার ক্ষেত্রে ১২০০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না—স্পষ্ট বার্তা প্রশাসনের। নির্ধারিত দামের বেশি টাকা আদায়, দালালচক্রের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো কিংবা বালি কারবারে কোনও ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বালি ঘাটের লিজ বাতিলও হতে পারে।
বালির দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বৃহস্পতিবার আসানসোলে জেলাশাসকের দফতরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। জেলাশাসক এস. পন্নমবলমের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলার বিধায়ক, প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিক এবং বৈধ বালি ঘাটের লিজধারীরা। বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল বালির দাম নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অবৈধ কারবারে রাশ টানা এবং বৈধ পরিবহণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।
প্রশাসনের নজর এখন বালি ঘাটগুলির উপর। নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি নজরদারি দলের দায়িত্বেও পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই আধিকারিক বা দলকে দীর্ঘদিন একটি ঘাটে রেখে যাতে নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল না হয়, সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে সমস্ত ঘাটে এখনও সিসিটিভি নেই, সেখানে দ্রুত ক্যামেরা বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পশ্চিম বর্ধমানে বর্তমানে ১৫টি বৈধ বালি ঘাট চালু রয়েছে। আরও ১২টি ঘাট পরিবেশগত ছাড়পত্রের অপেক্ষায়। ওই ঘাটগুলি অনুমোদন পেলে বৈধ বালির জোগান বাড়বে বলে আশা প্রশাসনের। তাতে সরবরাহের উপর চাপ কমার পাশাপাশি বাজারদরও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈধ ঘাটের বাইরে বালির সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। অণ্ডাল, আসানসোল ও দুর্গাপুর পুরনিগম এলাকা এবং দুর্গাপুর-ফরিদপুর ব্লকের কিছু অংশে স্টক পয়েন্ট তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, উপযুক্ত জায়গায় স্টক পয়েন্ট হলে পরিবহণের দূরত্ব কমবে। তবে বালি ঘাট থেকে পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরে স্টক পয়েন্ট তৈরি করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন।
অবৈধ বালি পরিবহণ রুখতে বিডিও, বিএলআরও এবং রাজস্ব পরিদর্শকদের সমন্বয়ে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের সহযোগিতাও নেওয়া হবে। শুধু ঘাটে বালির দাম নয়, সেখান থেকে ক্রেতার হাতে পৌঁছনোর পর কত দামে বালি বিক্রি হচ্ছে, তার উপরও নজর রাখবে প্রশাসন।
এদিকে বৈধ বালি পরিবহণ বাড়াতে ট্রাক্টর নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিডিও ও বিএলআরও-র যৌথ দল আগ্রহী গাড়িমালিকদের সহযোগিতা করবে। প্রশাসনের যুক্তি, নিবন্ধিত বাণিজ্যিক গাড়ির সংখ্যা বাড়লে পরিবহণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসবে এবং অবৈধ পরিবহণে ব্যবহৃত গাড়িও সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
সরকারি প্রকল্পেও যাতে বালির অভাবে কাজ আটকে না যায়, সেদিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় শৌচাগার নির্মাণ-সহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত বালি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঘাটের লিজধারীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে পশ্চিম বর্ধমানের বেহাল রাস্তার প্রসঙ্গও ওঠে। লাগাতার বৃষ্টিতে বেশ কিছু এলাকায় রাস্তা মেরামতির কাজ ব্যাহত হলেও একাধিক প্রকল্পে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে। আবহাওয়া অনুকূল হলেই আসানসোল পুরনিগম, আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, দুর্গাপুর পুরনিগম ও জেলা পরিষদের উদ্যোগে কাজ শুরু হবে। ১০ অক্টোবরের মধ্যে যত বেশি সম্ভব রাস্তার মেরামতির কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বালির বাড়তি দাম নিয়ে সরব হন আসানসোল উত্তরের বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, বালির দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের নির্মাণকাজ সমস্যায় পড়ছে। নির্ধারিত ১২০০ টাকার বেশি নেওয়া বা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
প্রশাসনের বার্তা স্পষ্ট—বালির দামে কারচুপি বা অবৈধ কারবার বরদাস্ত করা হবে না। কোনও ঘাটের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে তদন্তে তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট লিজধারীর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে লিজ বাতিলের মতো সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।
বৈঠকে এডিএম, এসডিও, এসডিএলআরও, বিডিও, বিএলআরও, পুলিশ আধিকারিক, বৈধ বালি ঘাটের লিজধারী এবং জনপ্রতিনিধিদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
September 25, 2026
Rating:


No comments: