বৈদিক আচার বা পৌরাণিক আড়ম্বরের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিজস্ব লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির উপাসনাকে কেন্দ্র করেই পালিত হয় এই উৎসব। আদিবাসী সমাজ মূলত প্রকৃতিনির্ভর। জল, জঙ্গল ও জমির সঙ্গে তাঁদের জীবনযাত্রার গভীর সম্পর্ক। লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের মতে, ছাতা পরব আসলে একটি শস্যোৎসবও বটে। ভাদ্র মাসে আমন ধানের খেত যখন সবুজে ভরে ওঠে এবং ফসল ঘরে তোলার সময় এগিয়ে আসে, তখন পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষার কামনায় প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা জানান আদিবাসীরা।
এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বিশাল একটি খুঁটির মাথায় উঁচু করে ছাতা মেলে ধরা। আদিবাসী লোকবিশ্বাসে এই ছাতা মেঘের প্রতীক। মানুষকে যেমন রোদ, ঝড়-বৃষ্টি থেকে ছাতা রক্ষা করে, তেমনই প্রতীকী এই ছাতা তাঁদের ফসল, পরিবার ও সমাজকে সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে আগলে রাখবে—এই বিশ্বাসেই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে ছাতা পরবের ঐতিহ্য।
তবে ছাতা মেলার গুরুত্ব শুধু পুজো-অর্চনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আদিবাসী সমাজের কাছে এটি একটি বড় সামাজিক মিলনক্ষেত্রও। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহার এবং বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এই মেলায় যোগ দেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে আসেন তরুণ-তরুণীরাও। দিন গড়িয়ে রাত পর্যন্ত ধামসা ও মাদলের তালে চলে পাতা নাচ, দাসাই নাচ-সহ বিভিন্ন আদিবাসী লোকনৃত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই নাচ-গানের আসরেই নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয়। একইসঙ্গে বহুদিন পর আত্মীয়-স্বজন ও পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগও করে দেয় এই মেলা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, বছরের এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকেন এলাকার মানুষ। দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়রা এই উপলক্ষে বাড়িতে ফিরে আসেন। মেলাকে ঘিরে বাড়িতে বাড়িতে চলে অতিথি আপ্যায়ন, আর মেলা প্রাঙ্গণে জমে ওঠে আদিবাসী ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানের আসর। ফলে ছাতা পরব তাঁদের কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় বা লোকাচারভিত্তিক অনুষ্ঠান নয়, বরং নিজেদের সংস্কৃতি, শিকড় এবং সামাজিক বন্ধনকে নতুন করে উদযাপনের দিন।
এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি জানান, আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভার মণ্ডল-৩-এর আমলাবাদে আদিবাসী সমাজের এই পবিত্র ও ঐতিহ্যবাহী ছাতা মেলায় অংশ নিতে পেরে তাঁর ভালো লেগেছে। মেলার সুন্দর পরিবেশে এলাকার মানুষের সঙ্গে দেখা করা, তাঁদের সঙ্গে কথা বলা এবং কিছুটা সময় কাটানোর অভিজ্ঞতার কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ধরনের মেলা মানুষকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।
ধর্মস্থান ও মেলা প্রাঙ্গণে এদিন উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী সমাজের একাধিক বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজন। তাঁদের কথায়, ছাতা পরব তাঁদের কাছে পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয়ের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। তাই সময়ের সঙ্গে বদল এলেও এই উৎসবের মূল সুর ও ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আগামী প্রজন্মের হাতেও ছাতা পরবের উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার অঙ্গীকারই যেন প্রতিধ্বনিত হল ডামরা আমলাবাদের মেলা প্রাঙ্গণে।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
September 20, 2026
Rating:


No comments: