রানীগঞ্জ -: ইতিহাসের সাক্ষী এক জলাশয়কে ঘিরে এবার তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। রানীগঞ্জ ব্লকের মঙ্গলপুর মৌজায় প্রায় ১৫২ কাঠা জমির উপর বিস্তৃত ঐতিহাসিক ‘মালা পুকুর’-এর একাংশ মাটি ফেলে ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পুকুর সংলগ্ন জমির ব্যবহারকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে জলাশয়ের একাংশের চরিত্র বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ২২ কাঠা অংশ ভরাট হয়ে গিয়েছে বলেও অভিযোগ। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও সরকারি তদন্তে যাচাই করা হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ব্রিটিশ আমল এবং রাজবাড়ির সময় থেকেই মঙ্গলপুরের এই জলাশয়ের অস্তিত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার জলসম্পদ ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত এই পুকুরটি বর্তমানে সরকারি ভূমি রেকর্ডে আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নামে নথিভুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ, অতীতে পুকুর সংলগ্ন কিছু জমি এক ব্যবসায়ীকে লিজ দেওয়া হয়েছিল। সেই লিজের জমিকে কেন্দ্র করেই বর্তমানে পুকুরের একাংশে মাটি ফেলার কাজ চলছে। স্থানীয়দের আরও দাবি, ইতিমধ্যে প্রায় ২২ কাঠা অংশ ভরাট করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পাকা সীমানা প্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। একটি সরকারি নথিভুক্ত জলাশয়ের একাংশ যদি সত্যিই ভরাট হয়ে থাকে, তাহলে সেই কাজের অনুমোদন ছিল কি না, জমির সরকারি রেকর্ডে তার বর্তমান চরিত্র কী এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরদারি কতটা ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখন খুঁজছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন মঙ্গলপুরের বাসিন্দা দিনেশ মাহাতো। তাঁর দাবি, পুকুরটির সঠিক মাপজোক ও সীমানা নির্ধারণের জন্য তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। রানীগঞ্জের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
দিনেশ মাহাতোর বক্তব্য, “সময় থাকতে পুকুরটির সরকারি মাপজোক ও সীমানা নির্ধারণ করা দরকার। তা না হলে ভবিষ্যতে পুকুরের আরও অংশ ভরাট বা দখলের আশঙ্কা থেকে যাবে।”
জলাশয় ভরাটের অভিযোগ সামনে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসছে পরিবেশ ও ভূমি আইনের প্রশ্নও। পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার আইন, মৎস্য আইন এবং জলাশয় সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিনিষেধে জলাশয়ের চরিত্র পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে মঙ্গলপুরের ‘মালা পুকুর’-এর ক্ষেত্রে কোনও জমির চরিত্র পরিবর্তন বা ভরাটের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে স্থানীয় সূত্রের দাবি, পুকুরটির জমি ‘কনভার্সন’ বা জমির চরিত্র পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে এ ধরনের কোনও প্রক্রিয়া শুরু হয়ে থাকলে তার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ফলে গোটা বিষয়টি এখন দাঁড়িয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে— ১৫২ কাঠার ঐতিহাসিক এই জলাশয়ের কতটা অংশ বর্তমানে অক্ষত? প্রায় ২২ কাঠা ভরাটের অভিযোগের সত্যতা কতটা? ভরাটের জন্য কোনও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি? জমির সরকারি রেকর্ডে বর্তমানে পুকুরটির চরিত্র কী রয়েছে? আর অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসনের পদক্ষেপই বা কী?
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কোনও পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়—প্রথমে সরকারি নথি খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। প্রয়োজনে সরকারি মাপজোক করে পুকুরের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করা হোক। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হোক।
কারণ ‘মালা পুকুর’ নিয়ে এই বিতর্ক এখন শুধুমাত্র একটি জলাশয় ভরাটের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, জমির আইনসম্মত ব্যবহার এবং প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন।
এখন নজর প্রশাসনের দিকে। মঙ্গলপুরের ঐতিহাসিক ‘মালা পুকুর’ নিয়ে ওঠা অভিযোগের কতটা সত্য, তা সরকারি তদন্তেই স্পষ্ট হবে। তবে তার আগে স্থানীয়দের একটাই দাবি—নথি খতিয়ে দেখা হোক, সরকারি মাপজোক হোক, এবং প্রকৃত সত্যটি প্রকাশ্যে আসুক।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
August 10, 2026
Rating:

No comments: