নিজস্ব প্রতিবেদক, আসানসোল -: মাত্র দুই মাস ১৩ দিনের এক শিশুকে এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে কেনার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে আসানসোলে। ই-মেলের মাধ্যমে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামে আসানসোল উত্তর থানার পুলিশ। তদন্তের সূত্র ধরে উত্তর ধাদকার লালবাংলা এলাকা থেকে এক দম্পতির হেফাজত থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় দম্পতি-সহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গ্রেফতারদের মধ্যে রয়েছেন উত্তর ধাদকার লালবাংলা এলাকার বাসিন্দা বিনোদ কুমার গুপ্তা, তাঁর স্ত্রী বাবিতা গুপ্তা এবং ধাদকা রোডের বাসিন্দা অশোক ভবলকা। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে অশোকের ভূমিকা কথিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযোগ পাওয়ার পরই শিশুটির পরিচয় এবং তার ওই দম্পতির কাছে পৌঁছনোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিনোদ ও বাবিতা দাবি করেন, শিশুটি তাঁদের জৈবিক সন্তান। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে সেই দাবিকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসে। এরপর শিশুটির জন্ম-সংক্রান্ত নথি, পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় রেকর্ড পরীক্ষা শুরু করে পুলিশ।
তদন্তে প্রাথমিকভাবে কথিতভাবে উঠে এসেছে, বীরভূমের সিউড়ির একটি বেসরকারি নার্সিংহোম থেকে এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে নেওয়া হয়েছিল। তবে এই তথ্যের চূড়ান্ত সত্যতা এখনও নিশ্চিত করেনি পুলিশ। নার্সিংহোমের নথি, শিশুটির জন্মের রেকর্ড এবং ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনার তদন্ত এখন আসানসোল ছাড়িয়ে সিউড়িতেও পৌঁছেছে। শিশুটির প্রকৃত জৈবিক বাবা-মা কারা, কোথায় তার জন্ম হয়েছিল এবং জন্মের পর কোন পরিস্থিতিতে সে আসানসোলের ওই দম্পতির কাছে পৌঁছল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। পাশাপাশি, নার্সিংহোম থেকে শিশুটিকে কারা এবং কীভাবে দম্পতির কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, শিশুটিকে আইন মেনে দত্তক নেওয়া হয়েছিল কি না। দত্তক গ্রহণের নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, জন্ম শংসাপত্রে প্রকৃত বাবা-মায়ের নাম রয়েছে কি না এবং কোনও নথিতে তথ্য বিকৃত করা হয়েছিল কি না—সবই পরীক্ষা করছেন তদন্তকারীরা।
অভিযোগে উঠে আসা এক লক্ষ টাকার লেনদেন নিয়েও তদন্ত চলছে। টাকা কে দিয়েছিল, কে গ্রহণ করেছিল এবং নগদ নাকি ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল—তার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই অর্থ শুধুমাত্র শিশুটিকে হস্তান্তরের বিনিময়ে দেওয়া হয়েছিল, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল, সেটিও জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
উদ্ধার হওয়া শিশুটিকে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া মেনে শিশু কল্যাণ কমিটির সভাপতির সামনে পেশ করা হয়েছে। শিশুটির নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিচর্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীরা বিষয়টিকে শুধুমাত্র বেআইনি দত্তক গ্রহণের অভিযোগ হিসেবে দেখছেন না। এর পিছনে কোনও বৃহত্তর শিশু পাচার বা মানবপাচার চক্র রয়েছে কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি ধ্রুব দাস জানান, গ্রেফতার তিন অভিযুক্তকে বৃহস্পতিবার আসানসোল আদালতে পেশ করা হবে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হবে। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে শিশুটির জৈবিক বাবা-মা, কথিত অর্থের লেনদেন, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এবং সিউড়ির নার্সিংহোমের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হবে।
তবে পুলিশি তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। শিশুটির প্রকৃত পরিচয়, তার জৈবিক বাবা-মা এবং কীভাবে সে ওই দম্পতির কাছে পৌঁছেছিল—এই প্রশ্নগুলির চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট হবে না। পাশাপাশি, এই ঘটনায় গ্রেফতার তিনজন ছাড়াও আর কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
শিশুকে ঘিরে উঠে আসা এই অভিযোগ ইতিমধ্যেই শিশু সুরক্ষা ও আইনসম্মত দত্তক গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। এখন পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
August 20, 2026
Rating:

No comments: