এদিন আসানসোলের আশ্রম মোড় থেকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য মিছিল। বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ, বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের কর্মী ও নেতৃত্বের পাশাপাশি সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও মিছিলে অংশ নেন। আশ্রম মোড় থেকে শুরু হওয়া মিছিল আসানসোল শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পরিক্রমা করে শেষ হয় বি এন আর মোড় সংলগ্ন রবীন্দ্র ভবনে।
মিছিলে কয়েক হাজার মহিলা ও পুরুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঐতিহ্যবাহী পোশাক, হাতে সংস্কৃতির প্রতীকী অস্ত্র এবং ধামসা-মাদলের বাদ্যিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। স্লোগান দিতে দিতে মিছিলে হাঁটতে দেখা যায় বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজনকে। উৎসবের আবহের মধ্যেও মিছিল থেকে উঠে আসে নিজেদের অধিকার, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষার বার্তা
বিশ্ব আদিবাসী দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ইতিহাস। ১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট জেনেভায় রাষ্ট্রসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত কার্যগোষ্ঠীর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ৯ আগস্ট দিনটিকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনধারা এবং তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এই দিবসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আসানসোলেও এদিনের কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব পায় আদিবাসী সমাজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। মিছিল শেষে রবীন্দ্র ভবনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে সংগঠনের পক্ষ থেকে ছাত্রছাত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্যের মাধ্যমে সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামাজিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
সংগঠনের সম্পাদক মতিলাল সরেন জানান, রাষ্ট্রসংঘ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ঘোষণা করার পর থেকেই আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে এই দিনটি পালন করে আসছেন তাঁরা। তাঁর দাবি, ২০০৫ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এই কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। তিনি বলেন, বিশ্ব আদিবাসী দিবসের দিনে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এক জায়গায় মিলিত হন। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নাচ, গান ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্প্রীতির বার্তাও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁর কথায়, এই দিনটি শুধু উৎসবের দিন নয়, নিজেদের শিকড়, ঐতিহ্য ও পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি পশ্চিম বর্ধমান জেলার সমস্ত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান তিনি। বক্তব্য রাখতে গিয়ে অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে জনজাতীয় সমাজের উন্নয়ন ও কল্যাণের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। সেই ধারায় আসানসোলে আদিবাসী সমাজের পক্ষ থেকে এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি সমাজকে আরও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভবিষ্যতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও এই ধরনের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের পক্ষ থেকে রামলাল টুডু, হীরালাল সরেন, পশ্চিম বর্ধমানের মাঝি-মাপাজি মান্ডওয়ার জেলা মাঝি কান্দন হাঁসদা-সহ বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের নেতৃত্ব, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে এদিন আসানসোলের রাজপথে শুধু একটি মিছিলই দেখা যায়নি। ধামসা-মাদলের প্রতিটি তালে, ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রতিটি রঙে এবং মানুষের কণ্ঠের প্রতিটি স্লোগানে যেন প্রতিধ্বনিত হয়েছে একটাই বার্তা—উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলার পাশাপাশি নিজের শিকড়, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখাই আদিবাসী সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
August 09, 2026
Rating:


No comments: