রাজনৈতিক সংঘাত ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে আতঙ্কিত রাইপাড়া: পুরুষশূন্য এলাকা, দায়িত্বে শুধু মহিলা ও শিশু
আসানসোল -: আসানসোল নর্থ থানার অন্তর্গত ওয়ার্ড নম্বর ১৩-এর রাইপাড়া এলাকা গত কয়েকদিন ধরে কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। পুলিশের অভিযানের আশঙ্কা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে এলাকার অধিকাংশ পুরুষ—স্বামী, ভাই, ছেলে ও আত্মীয়রা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। বর্তমানে এলাকায় শুধুমাত্র মহিলা ও ছোট ছোট শিশুরাই বসবাস করছেন, যা গোটা অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় মহিলাদের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির রাজনৈতিক সংঘাতের বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচন বা বড় উৎসবের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সমাজসেবী সংগঠন এলাকায় কম্বল, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করে থাকেন।
এই প্রেক্ষাপটে কল্লা মোড় এলাকার সমাজসেবী ও বিজেপি নেতা কৃষ্ণ প্রসাদ তাঁর সহযোগীদের নিয়ে সালাডাঙা এলাকায় একটি কম্বল বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল এবং রাইপাড়া ও ছুঁতা ডাঙা এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের বহু মানুষ সেখানে কম্বল নিতে উপস্থিত হয়েছিলেন।
কিন্তু সেই সময় ঘটনাস্থলে তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু কর্মী উপস্থিত হয়ে কৃষ্ণ প্রসাদের বিরুদ্ধে “গো ব্যাক” স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কৃষ্ণ প্রসাদ সেখান থেকে সরে যান। পরে তাঁর সমর্থকেরা বাকি কম্বল সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন।
এরপরই সালাডাঙা সংলগ্ন একটি গ্রামের এক মহিলা কৃষ্ণ প্রসাদ ও তাঁর কয়েকজন সমর্থকের বিরুদ্ধে কম্বল বিতরণের সময় শ্লীলতাহানির অভিযোগ দায়ের করেন। ওই মহিলার আরও অভিযোগ, কৃষ্ণ প্রসাদ জোর করে তাঁর জমি দখল করেছেন।
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূল নেতা শ্যাম সোরেন-এর নেতৃত্বে আদিবাসী সমাজের একাংশ আসানসোল নর্থ থানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।
অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং একাধিক জায়গায় অভিযান চালায়। অভিযানের সময় রাইপাড়ার বাসিন্দা পুষ্পরাজ দাস-কে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এই গ্রেপ্তারের ঘটনার পরই আতঙ্কে গোটা এলাকার পুরুষরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান।
ফলে বর্তমানে রাইপাড়ায় শুধুমাত্র মহিলা ও শিশুরাই রয়েছেন। পুরুষদের অনুপস্থিতিতে পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছে মহিলাদের কাঁধে। স্থানীয় মহিলাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে পরিবারগুলির আর্থিক সংকট দেখা দিতে পারে এবং শিশুদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে আদিবাসী সমাজের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। একাংশ মহিলার অভিযোগকে সত্য বলে দাবি করলেও, অন্য একটি অংশ পুরো ঘটনাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে আসানসোল নর্থ থানার অন্তর্গত রামকৃষ্ণ ডাঙাল এলাকায় বিজেপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক বড় কম্বল বিতরণ কর্মসূচিতে পদপিষ্ট হয়ে তিনজন মহিলার মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনায় বিজেপি নেতা জিতেন্দ্র তিওয়ারি-সহ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় এবং গ্রেপ্তারও করা হয়।
বর্তমান ঘটনায় যদিও কোনও প্রাণহানি বা পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেনি, তবে শ্লীলতাহানির গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিজেপির রাজ্যস্তরের নেতা কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিজেপি কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার না করা হলে দল বৃহত্তর আন্দোলনে নামবে।
অন্যদিকে, পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসানসোলসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা ও উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
February 06, 2026
Rating:

No comments: