ঐতিহ্যের ধারায় আদিবাসী গ্রামে আজও ‘রানকোটেঃ রান বেনাও’— মাঘ মাসে জড়িবটি ওষুধ তৈরির প্রাচীন প্রথা পালন
যীশু হেমব্রম, রানীগঞ্জ -: ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন প্রথা ও রীতিনীতি মেনে আজও আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের গ্রামগুলিতে পালিত হচ্ছে ‘রানকোটেঃ রান বেনাও বঙ্গাবুরু কামিহরা’। মূলত মাঘ মাসের শেষের দিকে এই বিশেষ প্রথা পালন করা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই সংস্কৃতি আজও অটুট রয়েছে আদিবাসী সমাজে।
সহরায় উৎসব শেষ হওয়ার পর মাঘ মাসের প্রথম দিকেই প্রত্যেকটি আদিবাসী গ্রামে গ্রাম সভার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় সালসি সভা। এই সভায় গ্রামের মাঝি মড়লদের নেতৃত্বে গ্রামের পুরুষদের সঙ্গে বসে গ্রামের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—খুঁটি-নাটি নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে গ্রামের পাঁচ মাঝি মড়ল ও সমস্ত পুরুষ একত্রে একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করেন, যা আদিবাসী সাঁওতাল সমাজে পরিচিত ‘মাঘ মুন্ডো’, ‘মাঘ সিম বঙ্গাবুরু’ ও ‘রানকোটেঃ রান বেনাও কামিহরা’ নামে।
দিনক্ষণ নির্ধারিত হওয়ার পর গ্রামের পাঁচ মাঝি মড়লসহ সমস্ত পুরুষ একত্রিত হয়ে নিজেদের ইষ্ট দেবতা মারাং বুরু’র পুজো ও অর্চনা করেন। এরপর শুরু হয় ‘রানকোটেঃ’— অর্থাৎ প্রাকৃতিক জড়িবটি ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া। এই ওষুধ সাধারণত গ্রামের অবিবাহিত যুবকরাই তৈরি করে থাকেন।
ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান— গাছের ছাল, ফল ও মূল। শিল-নোড়া দিয়ে এই উপাদানগুলি গুঁড়ো করে ছোট ছোট গোলক আকারে জড়িবটি ওষুধ তৈরি করা হয়। সাধারণত দুই ধরনের জড়িবটি প্রস্তুত করা হয়—
একটি গ্রামের মানুষের ব্যবহারের জন্য এবং অন্যটি গ্রামের গবাদি পশুর জন্য।
মঙ্গলবার এমনই এক দৃশ্য দেখা গেল রানীগঞ্জ থানার অন্তর্গত রানিসায়ের একটি আদিবাসী গ্রামে।
গ্রামের মাঝি মড়লরা জানান,
“আমরা আদিবাসী জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত প্রকৃতি পূজারী ও প্রকৃতি বিশ্বাসী। আমাদের বাপ-দাদাদের সময় থেকেই প্রাকৃতিক ওষুধ ব্যবহার করে আসছি। আজও সেই প্রাচীন প্রথা ও রীতি মেনে মাঘ মুন্ডো, মাঘসিম বঙ্গাবুরু ও রানকোটেঃ সম্পূর্ণ করলাম। এই জড়িবটি ওষুধ আমরা গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিই, যাতে কারও কোনও অসুবিধা হলে তা খেয়ে উপকার পায়। বহু বছর ধরে এই ওষুধ গ্রামের মানুষের উপকার করে আসছে— এটাই আমাদের বিশ্বাস।”
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গ্রামের পাঁচ মাঝি মড়লসহ গ্রামের একাধিক পুরুষ সদস্য।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
February 10, 2026
Rating:

No comments: