পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের জয়: ফিরে পেল আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী অস্থি বিসর্জন ঘাট ‘হাড়াভাঙ্গা–ডামালিয়া জাং বাহা বহেলঘাট’ কয়লা লোভী জমি হাঙ্গরদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আদিবাসী সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জোরে রক্ষা পেল শ্মশান ঘাট
নিজস্ব প্রতিনিধি,রানীগঞ্জ -: সালটা ছিল ঠিক জানুয়ারি ২০২০, পশ্চিম বর্ধমান জেলা জুড়ে তখন আদিবাসী সমাজ পালন করছিল তাদের ঐতিহ্যবাহী সোহরায় উৎসব। সেই আনন্দের মাঝেই বজ্রাঘাতের মতো নেমে আসে এক ভয়ংকর খবর—রানীগঞ্জ থানার অন্তর্গত হাড়াভাঙ্গা–ডামালিয়া আদিবাসী শ্মশান ঘাট জেসিবি মেশিন দিয়ে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। অভিযোগ ওঠে, কয়লা লোভী জমি হাঙ্গর ও কয়লা ব্যবসায়ীরা ওই শ্মশান ঘাটের নিচে থাকা বিপুল কয়লা সম্পদ উত্তোলনের উদ্দেশ্যেই এই উচ্ছেদ শুরু করেছে।
এই খবর মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে তিরাট আদিবাসী এলাকায়। একের পর এক আদিবাসী গ্রাম থেকে মানুষজন ছুটে আসেন হাড়াভাঙ্গা–ডামালিয়া শ্মশান ঘাটে। তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয় উচ্ছেদ কাজ। শুরু হয় প্রতিবাদ। ধাপে ধাপে বৈঠক, আলোচনা এবং সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। আসানসোল–দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিভিন্ন থানা এলাকার আদিবাসী মানুষজন সেখানে জমায়েত হতে থাকেন। অচিরেই প্রতিবাদ রূপ নেয় এক বৃহত্তর আন্দোলনে।
এই আন্দোলনের মধ্যেই সামনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য। এক আদিবাসী লেখকের হাত ধরে জানা যায়, হাড়াভাঙ্গা–ডামালিয়া শ্মশান ঘাটের উল্লেখ রয়েছে একটি পৌরাণিক গ্রন্থে। বইটির নাম ‘হড় করেন মারে হাপড়াম কুওয়া কাথা’। গ্রন্থটির লেখক রেভারেন্ড এল. ও. স্ক্রেভরুট। ঝাড়খণ্ডের কারাম গুরু–কল্যাণ গুরু এবং আসামের জুগী হাড়াম গুরু-র কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ১৮৮৭ সালে রোমান লিপিতে এই বইটি লেখা হয় এবং পরবর্তীতে পিও. বোর্ডিং-এর মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়।
এই ঐতিহাসিক তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই আন্দোলন আরও জোরদার হয়। কিন্তু আন্দোলন দমন করতে জমি হাঙ্গর ও কয়লা ব্যবসায়ীরা মোটা অঙ্কের টাকার লোভ দেখাতে শুরু করে। কিছু মানুষ সেই প্রলোভনে পা দিয়ে আন্দোলন থেকে সরে যান। ফলে এক সময় আদিবাসী সমাজের মধ্যেই বিভাজন সৃষ্টি হয় এবং বাকযুদ্ধ শুরু হয়। আন্দোলনের গতি কিছুটা স্তিমিত হলেও দমে যায়নি মূল লড়াই।
শ্মশান ঘাট রক্ষার দাবিতে যাঁরা অটল ছিলেন, তাঁদের উপর নেমে আসে প্রাণনাশের হুমকি, মিথ্যা মামলার চাপ। তবুও লড়াই থামেনি। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ভারতবর্ষে আদিবাসীদের মোট পাঁচটি অস্থি বিসর্জন ঘাট রয়েছে—
গাইঘাট, তিরিয়ো, হাতকুন্ডা বাঁধাঘাট, তেলকুপি বারনি ঘাট এবং হাড়াভাঙ্গা–ডামালিয়া জাং বাহা বহেলঘাট।
এই তথ্য পৌঁছে যায় অল ইন্ডিয়া আদিবাসী কো-অর্ডিনেশন কমিটির সম্পাদক মতিলাল সরেনের কাছে। এরপর আন্দোলনের রূপরেখা বদলে যায়, আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয় প্রতিবাদ।
শ্মশান ঘাট রক্ষার আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন পশ্চিম বর্ধমান আদিবাসী স্টুডেন্টস অ্যান্ড ইউথ ফোরামের সভাপতি হীরালাল সরেন, পশ্চিম বর্ধমান মাঝি মাপাজি মান্ডওয়ার রামলাল টুডু, কান্দন হাঁসদা, বিশু হেমব্রম, বাদল মাঝি-সহ বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামের মাঝি-মোড়লরা। আদিবাসী কড়া সমাজের পক্ষ থেকেও জীবন বাজি রেখে আন্দোলনে যোগ দেন কিশোর কড়া, জনার্দন কড়া, তপন কড়া-সহ বহু মানুষ।
এক পর্যায়ে আন্দোলন এতটাই তীব্র হয় যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা দায়ের করা হয়। তবুও থামেনি লড়াই। পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একের পর এক ডেপুটেশন, প্রতিবাদ মিছিল চলতে থাকে।
দীর্ঘ পাঁচ বছরের লাগাতার আন্দোলনের পর অবশেষে জয় আসে আদিবাসী সমাজের। ফিরে পাওয়া যায় ঐতিহাসিক শ্মশান ঘাট। নতুন করে তার নামকরণ হয়—
‘হাড়াভাঙ্গা–ডামালিয়া জাং বাহা বহেলঘাট’।
এই প্রসঙ্গে রামলাল টুডু বলেন,
“আগে আমরা জানতাম না যে এটি আমাদের আদিবাসীদের অস্থি বিসর্জন ঘাট। পরে ইতিহাস ঘেঁটে জানতে পারি, আমাদের সম্প্রদায়ের মোট পাঁচটি অস্থি বিসর্জন ঘাট রয়েছে, যার শেষটি এই হাড়াভাঙ্গা–ডামালিয়া জাং বাহা বহেলঘাট। আমাদের পূর্বপুরুষরা এখানে অস্থি বিসর্জন দিতেন। প্রাণনাশের হুমকি সত্ত্বেও আমরা এই ঘাট রক্ষা করতে পেরেছি—এটা আমাদের গর্ব।”
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এই বছরও মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই ঘাটে পূজা-অর্চনা ও আদিবাসী নৃত্যের আয়োজন করা হয়। রবিবার মাঘী পূর্ণিমায় দেখা যায় অসংখ্য আদিবাসী ভক্তের ভিড়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার সভাধিপতি বিশ্বনাথ বাউরি, শিবু যাদব, মতিলাল সরেন, হীরালাল সরেন, রামলাল টুডু, জনার্দন কড়া, কিশোর কড়া, রমেশ টুডু, বাদল মাঝি-সহ আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও সংগঠনের কর্মীরা।
এই আন্দোলন শুধু একটি শ্মশান ঘাট রক্ষার লড়াই নয়—এটি আদিবাসী অস্তিত্ব, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার এক অনন্য দলিল হয়ে রইল পশ্চিম বর্ধমানের ইতিহাসে।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
February 02, 2026
Rating:

No comments: