ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি খুঁজতে ‘নিজের অপহরণ’, শেষমেশ জঙ্গলে মিলল নিথর দেহ—বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় মৃত্যু, বরাকরে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
নিজস্ব সংবাদদাতা, বরাকর/কুলটি -: মঙ্গলবার রাতেও হয়তো কেউ ভাবতে পারেনি, যে যুবককে খুঁজে পেতে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার হবে জঙ্গলের ভিতর থেকে। আর সেই মৃত্যুর নেপথ্যে উঠে আসবে এমন এক গল্প, যেখানে রয়েছে ঋণের চাপ, বাঁচার মরিয়া চেষ্টা, বিশ্বাসের সম্পর্ক এবং শেষ পর্যন্ত নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা।
পশ্চিম বর্ধমানের কুলটি থানার পুনুড়ি গ্রামের জঙ্গলে বুধবার সকালে উদ্ধার হয় ২৪ বছরের যুবক সোনু বিশ্বকর্মার দেহ। বরাকর স্টেশন রোডের আলুগদ্দি এলাকার বাসিন্দা সোনু ছিলেন স্থানীয় লটারি বিক্রেতা গণেশ বিশ্বকর্মার ছেলে। জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকা দেহটি প্রথম শনাক্ত করেন তাঁরই বোন। সেই মুহূর্তের কান্না আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ।
পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠালেও তদন্ত যত এগোতে শুরু করে, ততই সামনে আসতে থাকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
পুলিশ সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই ঋণের চাপে জর্জরিত ছিলেন সোনু। ধারদেনার বোঝা দিন দিন বেড়েই চলছিল। সেই চাপ থেকে মুক্তি পেতে তিনি নাকি এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে একটি বিপজ্জনক পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনাটি ছিল নিজের অপহরণের নাটক সাজিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা আদায় করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের কাছে ৬ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু যে পরিকল্পনা তাঁকে নতুন করে বাঁচার পথ দেখাবে বলে ভেবেছিলেন, সেই পরিকল্পনাই হয়ে ওঠে তাঁর মৃত্যুর কারণ।
তদন্তকারীদের অনুমান, মুক্তিপণের টাকা ভাগাভাগি নিয়েই শুরু হয় তীব্র অশান্তি। বন্ধুদের মধ্যেই তৈরি হয় বিরোধ। সেই বিরোধ একসময় রূপ নেয় হিংসায়। অভিযোগ, সোনুর ওপরই চড়াও হয় তাঁর সহযোগীরা। শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুন করে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে পুনুড়ি গ্রামের নির্জন জঙ্গলে দেহ ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা।
ঘটনার তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই বরাকরের বাসিন্দা রনি ঘোষ নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে কুলটি থানার পুলিশ। তবে তদন্তকারীদের মতে, এই ঘটনার সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারে। তাদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে।
এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় যখন ময়নাতদন্তের পর সোনুর মরদেহ বরাকরে পৌঁছায়, তখন শোক মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় জনরোষে। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। আর সেই কান্নার সঙ্গেই মিশে যায় এলাকার মানুষের ক্ষোভ।
দেখতে দেখতে শতাধিক মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বরাকর স্টেশন রোড অবরোধ করে শুরু হয় বিক্ষোভ। জ্বলতে থাকে টায়ার। খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সরব হয়ে ওঠেন প্রতিবাদকারীরা। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে বরাকর বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট (ওয়েস্ট)-এর এসিপি জাভেদ হুসেন, কুলটি থানার আইসি অশোক সিংহ মহাপাত্র এবং বরাকর ফাঁড়ির ওসি অঞ্জন রজক-সহ একাধিক পুলিশ আধিকারিক। দীর্ঘক্ষণ ধরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলে।
অন্যদিকে, ছেলের মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না সোনুর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের একটাই দাবি—এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীর ফাঁসি হোক। পরিবারের বক্তব্য, “যে বিশ্বাস করে বন্ধুর সঙ্গে পথ চলেছিল, সেই বন্ধুরাই যদি প্রাণ কেড়ে নেয়, তাহলে তার চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে?”
ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন রাজ্যের মন্ত্রী ডা. অজয় পোদ্দারও। তিনি জানিয়েছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং পুরো ঘটনার সত্য সামনে আনতে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন।
পুনুড়ির জঙ্গলে পড়ে থাকা সোনু বিশ্বকর্মার নিথর দেহ আজ শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং সমাজের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—ঋণের চাপ, অর্থের লোভ এবং ভুল সিদ্ধান্তের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক যুবকের জীবনের শেষ অধ্যায় কি এভাবেই লেখা হওয়ার ছিল?
এখন গোটা বরাকর-কুলটির মানুষ অপেক্ষা করছে পুলিশের তদন্তের দিকে। কারণ তারা জানতে চায়, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা সমস্ত মুখোশ কবে খুলবে, আর কবে মিলবে সোনু বিশ্বকর্মার মৃত্যুর প্রকৃত বিচার।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
June 03, 2026
Rating:

No comments: