পশ্চিমবঙ্গের বাজেটে উন্নয়নের মেগা ব্লুপ্রিন্ট: ৫ নতুন জেলা, উত্তরবঙ্গে এমস, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা
রাজ্যের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগকে পৃথক জেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের দাবি, নতুন জেলা গঠনের ফলে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে প্রশাসনিক পরিষেবা। ভূমি, রাজস্ব, সামাজিক সুরক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
শুধু জেলা নয়, পশ্চিম মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুরকে নতুন মহকুমা করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের মতে, এর ফলে জঙ্গলমহল এলাকার বিস্তীর্ণ অংশের মানুষের সরকারি পরিষেবা প্রাপ্তি আরও সহজ হবে।
দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিবমন্দির, গাজোল, চাঁচল, বেলদা, বধানা, কামারপুকুর এবং কোলাঘাটে সাতটি নতুন পুরসভা গঠনের ঘোষণাও করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে পানীয় জল, নিকাশি, রাস্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পথবাতি এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবার পরিকাঠামো উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে একটি পৃথক পুলিশ জেলা গঠনের প্রস্তাব ঘোষণা করে অর্থমন্ত্রী জানান, অপরাধ দমন ও দ্রুত পুলিশি পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন পুলিশ জেলা চালু হলে উপকূলবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও জোরদার হবে বলে প্রশাসনের বিশ্বাস।
তবে এবারের বাজেটের মূল আকর্ষণ নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্য খাত। উত্তরবঙ্গে একটি সর্বভারতীয় আয়ুর্বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (এমস) এবং একটি বিশ্বমানের ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপনের ঘোষণা ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গের মানুষকে কলকাতা কিংবা ভিনরাজ্যে ছুটতে হয়েছে। নতুন এমস ও ক্যানসার হাসপাতাল বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের অঞ্চলের মধ্যেই অত্যাধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সম্প্রসারণে বেসরকারি ক্ষেত্রকেও অংশীদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন হাসপাতাল নির্মাণে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে আহ্বান জানানো হলেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে মোট শয্যার অন্তত ৫০ শতাংশ সরকারি হাসপাতাল থেকে রেফার হওয়া রোগীদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। এই রোগীদের বিনামূল্যে অথবা স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসা পরিষেবা দিতে হবে। ফলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষেরাও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
এছাড়া মুম্বই, ভেল্লোরসহ দেশের বিভিন্ন উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য যাতায়াতকারী রোগী ও তাঁদের পরিবারের কথা মাথায় রেখে স্বল্প খরচে আবাসনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই আবাসন প্রকল্পগুলি গড়ে তোলা হবে, যাতে চিকিৎসার সময় রোগীদের পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়ে।
চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে বড় সুখবর। রাজ্যের ১৩টি মেডিক্যাল কলেজে মোট ৬৫০টি নতুন এমবিবিএস আসন বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতের চিকিৎসক তৈরির পথ আরও প্রশস্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসকের ঘাটতি অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে প্রশাসনিক সংস্কার, স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রাজ্যের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরেছে সরকার। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয় তার দিকে।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
June 22, 2026
Rating:

No comments: