যীশু হেমব্রম, রানীগঞ্জ -: দারিদ্র্য, প্রতিকূলতা আর সংগ্রামকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলেছে তার জীবন। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। সংসারের হাল ধরতে মায়ের নিরন্তর লড়াই। সেই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও স্বপ্ন দেখতে ভোলেনি পাণ্ডবেশ্বরের আদিবাসী কিশোরী আশিকা হাঁসদা। আর সেই স্বপ্নকেই আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল রানীগঞ্জ থানার উদ্যোগে আয়োজিত ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনের সাফল্য।
শনিবার, সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পশ্চিম বর্ধমানের রানীগঞ্জ থানার পক্ষ থেকে পাঁচ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড়ের আয়োজন করা হয়। পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন প্রতিযোগী এই দৌড়ে অংশ নেন। মহিলাদের বিভাগে সকলকে পিছনে ফেলে মাত্র ১৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে প্রথম স্থান দখল করেন পাণ্ডবেশ্বরের ১৬ বছরের আদিবাসী ছাত্রী আশিকা হাঁসদা।
মহিলাদের বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন রানীগঞ্জের শ্রেয়সী দত্ত এবং তৃতীয় হন দুর্গাপুরের রিসিতা ঘোষ। পুরুষদের বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন রবি কুমার রাওত।
রানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক সুবীর কর্মকার এবং আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের এসিপি (সেন্ট্রাল-২) বিমান কুমার মৃধার নেতৃত্বে প্রতিযোগিতার শুভ সূচনা হয়। প্রতিযোগিতা সফল করতে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে এই ম্যারাথনের সবচেয়ে আলোচিত নাম এখন আশিকা হাঁসদা। আদিবাসী পরিবারের মেয়ে আশিকার জীবনের গল্প যেন এক অনুপ্রেরণার নাম। ছোট থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। নানা বাধা সত্ত্বেও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে তিনি দুর্গাপুর থেকে আসানসোলের বিভিন্ন কোচের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে রানীগঞ্জের রবিন সেন স্টেডিয়ামে নিয়মিত অনুশীলন করছেন।
প্রথম স্থান অর্জনের পর উচ্ছ্বসিত আশিকা বলেন, “২০১৭ সালে প্রথম ম্যারাথন দৌড়ে অংশগ্রহণ করি। তারপর থেকেই নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। আমার স্বপ্ন, একদিন ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিযোগিতা করা এবং দেশের নাম উজ্জ্বল করা। আজ প্রথম হয়ে খুব ভালো লাগছে। রানীগঞ্জ থানার আয়োজন অত্যন্ত সুন্দর ছিল। ভবিষ্যতেও এ ধরনের প্রতিযোগিতা হলে আমরা আরও উৎসাহ পাব।”
আশিকার সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি তার মা বাসন্তী হাঁসদা। চোখে জল আর মুখে গর্বের হাসি নিয়ে তিনি বলেন, “আমার তিন মেয়ের মধ্যে আশিকা সবচেয়ে ছোট। ওর বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। সংসার চালাতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকে ওর খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল। আমি যতটুকু পেরেছি ওকে সাহায্য করেছি। আজ ও প্রথম হয়েছে, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। আমি চাই, আমার মেয়ের সব স্বপ্ন পূরণ হোক।”
আশিকার এই সাফল্য শুধু একটি ম্যারাথন জয়ের গল্প নয়। এটি এক আদিবাসী কন্যার অদম্য লড়াইয়ের গল্প, এক মায়ের ত্যাগের গল্প এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে, প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে আশিকা আজ প্রমাণ করে দিয়েছে— ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই বড় নয়।
পাণ্ডবেশ্বর এর এই কিশোরীর সাফল্য এখন এলাকার গণ্ডি পেরিয়ে বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। অনেকেরই বিশ্বাস, আজকের এই ম্যারাথনের চ্যাম্পিয়ন আশিকা হাঁসদা একদিন দেশের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বাংলার মুখ উজ্জ্বল করবে।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
June 13, 2026
Rating:



No comments: