রানীগঞ্জ -: ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ইসিএল)-এর জারি করা উচ্ছেদ ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকরণের নোটিশকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার উত্তাল হয়ে উঠল রানীগঞ্জ থানার কুনুস্তড়িয়া এরিয়ার মহাবীর এলাকা। পরিস্থিতির জেরে অমৃতনগর কোলিয়ারির এজেন্ট অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভে সামিল হন মহাবীর গ্রাম রক্ষা কমিটি, আদিবাসী সমাজ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বাউরি সমাজ শিক্ষা সমিতি-সহ একাধিক সামাজিক সংগঠনের সদস্য এবং এলাকার শতাধিক বাসিন্দা।
জানা গিয়েছে, গত ২১ মে ইসিএলের পক্ষ থেকে মহাবীর এলাকায় একটি নোটিশ টাঙানো হয়। ওই নোটিশে অবৈধভাবে দখল করে থাকা ইসিএল কোয়ার্টার খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও উল্লেখ ছিল। এরপর থেকেই কয়েক হাজার বাসিন্দার মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মহাবীর এলাকায় বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছেন। তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ইসিএলের বিভিন্ন কয়লাখনিতে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের বসবাসের পর হঠাৎ করে উচ্ছেদ বা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত মানবিকতার পরিপন্থী এবং তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অমৃতনগর কোলিয়ারির এজেন্ট অফিসের সামনে জড়ো হতে থাকেন বাসিন্দারা। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলা বিক্ষোভে ইসিএল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের একটাই দাবি—কোনোভাবেই যেন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে উচ্ছেদ না করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। উপস্থিত ছিলেন আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের এসিপি (সেন্ট্রাল-২) বিমান কুমার মৃধা, রানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক সুবীর কর্মকার-সহ একাধিক পুলিশ আধিকারিক।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের জেলা সভাপতি মনিশ শর্মা সাংবাদিকদের বলেন,
"মহাবীর এলাকার মানুষ বহু বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। তাঁদের পূর্বপুরুষরা ইসিএলের কর্মী ছিলেন। হঠাৎ করে একটি নোটিশ জারি করে উচ্ছেদ বা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা ইসিএল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার দাবি জানিয়েছি।"
তিনি আরও জানান, ইসিএল কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে এবং বিদ্যুতের অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং আপাতত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাউরি সমাজ শিক্ষা সমিতির রাজ্য সভাপতি সুমন্ত বাউরী বলেন,
"মহাবীর এলাকায় প্রায় দশ হাজার মানুষের বসবাস। ইসিএল যখন খুশি একটি নোটিশ ঝুলিয়ে দেবে আর মানুষ চুপ করে থাকবে, তা কখনোই হবে না। আমরা কোনো দয়া বা ভিক্ষা চাইছি না, এটা আমাদের অধিকার। এলাকার মানুষের পূর্বপুরুষরা কয়লাখনিতে কাজ করেছেন। তাঁদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। তাই হঠাৎ করে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না।"
দীর্ঘ আলোচনার পর ইসিএল কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে জানায়, আপাতত কোনো ধরনের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকরণ বা উচ্ছেদ সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত আলোচনা সাপেক্ষে গ্রহণ করা হবে।
এদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন মহাবীর গ্রাম রক্ষা কমিটির সম্পাদক রঞ্জিত সিং, সমাজকর্মী জনার্দন কোড়া, রাজু মাহালী, বিশ্বজিৎ গড়াই, তেজ প্রতাপ সিং-সহ এলাকার বহু মহিলা ও পুরুষ।
যদিও ইসিএলের আশ্বাসে আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, তবুও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি মহাবীর এলাকার বাসিন্দাদের। এখন সকলের নজর ইসিএল কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
June 11, 2026
Rating:

No comments: