সরকার বদলালেও রমরমিয়ে চলছে অবৈধ ‘ঝাড়খণ্ড লটারি’, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা
নিজস্ব সংবাদদাতা, আসানসোল -: রাজ্যে সরকার পরিবর্তন ও নতুন প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের পরও আসানসোল শিল্পাঞ্চল এবং সংলগ্ন এলাকায় ‘ঝাড়খণ্ড লটারি’ নামে পরিচিত অবৈধ লটারির কারবার বন্ধ হয়নি। বরং অভিযোগ, নির্বাচনের পর ফের নতুন উদ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই চক্র। বিষয়টি সামনে আসতেই স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় কীভাবে এই অবৈধ ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, তা নিয়ে এলাকাজুড়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে নাকা তল্লাশির সময় বিপুল পরিমাণ অবৈধ লটারির টিকিট ও নগদ অর্থ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। সেই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। নির্বাচন চলাকালীন কিছুদিন এই ব্যবসার দৌরাত্ম্য কমলেও বর্তমানে ফের তা আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে বলে অভিযোগ উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এই অবৈধ লটারি ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র কুলটি এলাকা। অভিযোগ, কুলটি, নিয়ামতপুর, চৌরঙ্গি, কল্যাণেশ্বরী, সালানপুর, দেন্দুয়া, জেমাহারি এবং রূপনারায়ণপুর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক অবৈধ লটারির টিকিট বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে।
জানা গিয়েছে, সরকারি অনুমোদিত লটারির ফলাফলকে ভিত্তি করে দিনে তিনবার এই অবৈধ খেলা পরিচালিত হয়। প্রতিটি টিকিটের মূল্য ১০ থেকে ১২ টাকার মধ্যে। বেশি কমিশনের আশায় বিক্রেতারা এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় সাধারণ মানুষ এই খেলায় অংশ নিচ্ছেন। তবে পুরো প্রক্রিয়াটিই বেআইনি হওয়ায় সরকারের কোনও রাজস্ব আয় হচ্ছে না।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই চক্রের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কুলটি এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি গোটা নেটওয়ার্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। একইসঙ্গে সালানপুর, চৌরঙ্গি, দেন্দুয়া, জেমাহারি ও রূপনারায়ণপুর এলাকায়ও একাধিক ব্যক্তি খুচরো বিক্রেতাদের কাছে টিকিট সরবরাহ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই অভিযোগগুলির কোনও সরকারি স্বীকৃতি এখনও মেলেনি।
পুলিশের নজর এড়াতে সম্প্রতি এই সিন্ডিকেট নতুন কৌশলও গ্রহণ করেছে বলে জানা যাচ্ছে। ক্রেতারা এখন নিজেদের পছন্দের নম্বর বেছে নিতে পারছেন এবং বিক্রেতারা হাতে লেখা স্লিপের মাধ্যমে সেই নম্বর নথিভুক্ত করছেন। ফলে কোনও ডিজিটাল রেকর্ড না থাকায় তদন্তের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, অবৈধ লটারি ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ। বিজেপির দাবি, রাজ্য সরকার অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পরও যদি এই ধরনের অবৈধ ব্যবসা বন্ধ না হয়, তাহলে প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের মদত নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের দাবি, অবৈধ লটারির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। অতীতেও বহু টিকিট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং সন্দেহভাজন বিভিন্ন স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। খুব শীঘ্রই এই চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
সমগ্র ঘটনায় আসানসোল শিল্পাঞ্চলে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের একাংশের প্রশ্ন, এত অভিযানের পরও যদি অবৈধ লটারির ব্যবসা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে এর নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং কেন এখনও এই চক্র সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না— সেই উত্তরই এখন খুঁজছে এলাকার মানুষ।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
June 07, 2026
Rating:

No comments: