তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ধস: তিনের মৃত্যু, আটকে বহু শ্রমিক; পুরনো অনুমোদিত নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রীর
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা -: রাজধানী কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ একটি বহুতল গুদাম ভবন ধসে পড়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা রাজ্যে। বুধবারের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও এখনও একাধিক শ্রমিক আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সেনাবাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দমকল ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্তে নির্মাণ পরিকল্পনার কাঠামোগত ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে অনুমোদিত এই নির্মাণ প্রকল্পের নকশাতেই গলদ থাকতে পারে, যার ফলেই এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, পাঁচতলা বিশিষ্ট ইস্পাত কাঠামোর এই ভবনের নির্মাণ পরিকল্পনা গত ১৭ জানুয়ারি অনুমোদন পেয়েছিল। কলকাতা পুরসভার প্রকৌশল বিভাগের প্রাথমিক রিপোর্টে পরিকল্পনাগত ত্রুটির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর রাজ্য সরকার একটি বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে অনুমোদিত সমস্ত নির্মাণ প্রকল্পের উপর আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রতিটি প্রকল্প পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গিয়েছে, কলকাতা বন্দর ট্রাস্টের কাছ থেকে লিজ নেওয়া জমিতে একটি শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনকারী সংস্থার জন্য বিশাল গুদাম নির্মাণের কাজ চলছিল। প্রায় দেড় বছর ধরে এই প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছিল। স্থানীয় সূত্রে খবর, বুধবার সকাল থেকেই ভবনের বিশাল লোহার কাঠামোতে অস্বাভাবিক দুলুনির লক্ষণ দেখা যায়। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে কয়েকজন শ্রমিক নিচে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ছাদ ও ইস্পাতের কাঠামো।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ায় বড়সড় প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ‘গ্রিন করিডর’ তৈরি করে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রশাসনের অনুমান, এখনও ১২ থেকে ১৫ জন শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় ভবনের ভিতরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। তবে ঠিক কতজন এখনও নিখোঁজ বা আটকে রয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। উদ্ধারকারী দল গ্যাস কাটারের সাহায্যে বাঁকানো লোহার রড কেটে পথ তৈরি করছে এবং ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে। আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে অক্সিজেন ও পানীয় জল পৌঁছে দিতে ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন অংশে ছিদ্র করা হয়েছে।
এদিকে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জমি লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র ও অনুমোদন প্রদান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। নির্মাণের আগে পুরসভা এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে সমস্ত বৈধ ছাড়পত্র ও অনুমোদন নেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে লিজগ্রহীতার।
পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে নবান্নে একটি বিশেষ জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে একাধিক হেল্পলাইন নম্বরও চালু করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তারাতলার এই দুর্ঘটনা শুধু নির্মাণ নিরাপত্তা নিয়েই নয়, নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই সামনে আসবে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
June 24, 2026
Rating:

No comments: