নিজস্ব সংবাদদাতা, পশ্চিম বর্ধমান -: পশ্চিম বর্ধমান জেলা জুড়ে আদিবাসী সমাজের প্রাচীন রীতি-নীতি মেনে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হল বাহা বঙ্গা বা বাহা উৎসব। প্রকৃতি পূজারী আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই অন্যতম প্রধান উৎসবটি প্রতি বছরের মতো এ বছরও তিনদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা ১৬ ফাল্গুন, রবিবার (ফাল্গুন শুক্লপক্ষ ত্রয়োদশী) বাহা বঙ্গা মার্শাল চান্দু চট কুনোমি দিনে গ্রামের পুরোহিতরা জাহের সাড়িম দালব করেন এবং জাহের দেবতাদের স্নান করান। এই আচার পালনের মধ্য দিয়েই উৎসবের সূচনা হয়।
বাংলা ১৭ ফাল্গুন, সোমবার (ফাল্গুন শুক্লপক্ষ চতুর্দশী) বাহা বঙ্গা মার্শাল চান্দু বুরু কুনোমি দিনে আদিবাসী পুরোহিতরা জাহের বঙ্গা সারদি মাহা বঙ্গাবুরু এবং নতুন বছরের নতুন সাল ও মহুল ফুলের পুজো অর্চনা করেন।
পুজো শেষে জাহের থানে আরাধ্য দেবতার নাম করে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান। গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা নিজেদের ধর্মস্থান থেকে নাচতে নাচতে পুরোহিত, নাইকে বাবা ও কুডম নাইকে বাবাকে প্রত্যেকটি বাড়িতে নিয়ে যান। প্রতিটি বাড়ির মহিলারা নিজেদের বাড়ির দুয়ারে পুরোহিতদের পায়ে জল ও তেল দিয়ে পরিষ্কার করে প্রণাম জানান। পুরোহিতরা তাঁদের সাল ফুল বিতরণ করেন এবং সাল ফুলের জল মাথায় ছিটিয়ে আশীর্বাদ দেন। এই প্রথা মেনে গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়িতেই আচার সম্পন্ন হয়।
বাংলা ১৮ ফাল্গুন, মঙ্গলবার বাহা বঙ্গা মার্শাল চান্দু অত কুনোমি (ফাল্গুন শুক্লপক্ষ দোল পূর্ণিমা) বাহা বাস্কে পালনের মাধ্যমে বাহা উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
উৎসবের প্রথম দিন থেকেই আসানসোলের বড়ডাঙ্গা, নিয়ামতপুর, রানীগঞ্জের বাঁশড়া, রানিসায়ের এবং দুর্গাপুরের বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যায়। শেষ দিনে আসানসোলের হিরাপুর থানার অন্তর্গত হাড়াম-ডি আদিবাসী গ্রামে জমজমাট ঐতিহ্যবাহী বাহা নৃত্য, নাচ ও গানের আয়োজন দেখা যায়। সেদিন গ্রামের মহিলা ও পুরুষেরা ঐতিহ্যবাহী পাঁচি ধুতি ও পাঁচি শাড়ি পরে নাচ-গানে মেতে ওঠেন। পাশাপাশি একে অপরের মাথায় শাল ফুলের জল ঢেলে বাহা দাঃ প্রথা পালন করেন।
পশ্চিম বর্ধমান মাঞ্জহি মাপজি মান্ডওয়া ও আসানসোল মহকুমা মান্ডওয়ার মাঞ্জহি লক্ষীরাম মুরমু জানান, আমরা আদিবাসী ধর্মের প্রকৃতি পূজারী। প্রকৃতির উপরেই আমাদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। রবিবার থেকে শুরু হওয়া বাহা পুজো মঙ্গলবার পর্যন্ত চলেছে এবং প্রতি বছরের মতো এ বছরও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি।
অন্যদিকে হাড়াম-ডি গ্রামের সেনাপতি মতিলাল সরেন জানান, বাহা বঙ্গা উৎসবে আমরা যুগ যুগ ধরে জাহের থানে জাহের দেবতা ও শিশির জাড়ি দেবতার পূজা করে আসছি। আমরা প্রকৃতি পূজারী এবং প্রকৃতির কাছ থেকেই সবকিছু পেয়ে থাকি। তাই ঐতিহ্য মেনে প্রথম দিন জাহের দালব, দ্বিতীয় দিন পূজা এবং শেষ দিনে বাহা বাস্কে-এর মাধ্যমে প্রকৃতি দেবতার সেবা করেছি। এ বছরও নতুন গাছের নতুন সাল ফুল ও মহুল ফুলের পুজো সম্পন্ন হয়েছে।
তিনদিনব্যাপী এই উৎসবের মাধ্যমে পশ্চিম বর্ধমানের বিভিন্ন প্রান্তে আদিবাসী সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির প্রতি গভীর বিশ্বাসের উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখা যায়।
Reviewed by Social Tribal News Journalist
on
March 03, 2026
Rating:





No comments: