Social Tribal News

Social Tribal News delivers inclusive news coverage across Bengali, Santhali, Hindi, and English as a News Media Network.

Social Tribal News

Social Tribal News operates as a mainstream news platform presenting regional and international news in Bengali, Santhali, Hindi, and English, with recognition from the Ministry of Youth Affairs & Sports and MSME registration.

দাঁসায়ের ঐতিহ্য রক্ষায় আসানসোলে সেমিনার, অপসংস্কৃতি রুখে যুবসমাজকে শিকড়ের সন্ধান দিলেন মাঞ্জহি মোড়লরা



নিজস্ব প্রতিনিধি, পশ্চিম বর্ধমান -: শুধু নাচ-গান নয়, দাঁসায় সাঁওতাল সমাজের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারক। সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্যের প্রকৃত তাৎপর্য যেন হারিয়ে না যায়, নতুন প্রজন্মের কাছে দাঁসায়ের ইতিহাস ও পরম্পরাকে তুলে ধরতে উদ্যোগী হলেন আদিবাসী সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা। দাঁসায়ের নাম করে বিভিন্ন বাজার, রাস্তার মোড় ও রেলস্টেশনে অর্থ সংগ্রহের বর্তমান প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করলেন তাঁরা।

শনিবার পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা এলাকার পাল্টন ধাউড়া আদিবাসী অঞ্চলের কমিউনিটি হলে পশ্চিম বর্ধমান মাঞ্জহি মাপাজি মান্ডওয়া, ডামরা ১৬ পাড়া উদ্যোগে এবং জাতিয়ারি মাঞ্জহি মাপাজি গড়োসপোহৎ বায়সির (আসানসোল দক্ষিণ) সহযোগিতায় দাঁসায় উৎসবকে কেন্দ্র করে এক বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সাঁওতাল সমাজের পারগনা, মাঞ্জহি-মোড়ল, বুদ্ধিজীবী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দাঁসায়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, পৌরাণিক লোককথা এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন। মূল লক্ষ্য ছিল, বর্তমান যুবসমাজকে দাঁসায়ের প্রকৃত পরিচয় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা।

সাঁওতাল সমাজের সাংস্কৃতিক পরম্পরায় দাঁসায় একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ নৃত্য-গীতের ধারা। শরৎকালে, দুর্গাপুজোর সময়কে ঘিরে এই নাচ ও গানের প্রচলন রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে সাঁওতাল যুবকেরা দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দাঁসায় পরিবেশন করেন। তাঁদের পোশাক, নৃত্যভঙ্গি, বাদ্যযন্ত্র ও গানের মধ্যে ফুটে ওঠে সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।

দাঁসায়ের উৎপত্তি ও তাৎপর্য নিয়ে সাঁওতাল সমাজে একাধিক লোককথা ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের মৌখিক পরম্পরায় কোথাও পূর্বপুরুষদের সংগ্রাম ও আত্মপরিচয় রক্ষার স্মৃতি, কোথাও হারিয়ে যাওয়া আপনজন বা সমাজের পথপ্রদর্শককে খুঁজে ফেরার কাহিনি উঠে আসে। কিছু লোককথায় হুদুড় দুর্গা-সংক্রান্ত আখ্যানের সঙ্গেও দাঁসায়ের যোগসূত্রের কথা বলা হয়। তবে এই কাহিনিগুলির বিবরণ অঞ্চল ও পরম্পরাভেদে পৃথক। তাই এগুলিকে একটিমাত্র সর্বজনস্বীকৃত ইতিহাস হিসেবে দেখার পরিবর্তে সাঁওতাল সমাজের বহুমাত্রিক মৌখিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বোঝা জরুরি।

সেমিনারে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দাঁসায়ের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন বাজার, রাস্তার মোড় ও রেলওয়ে স্টেশনে অর্থ চাওয়ার প্রবণতা। সংগঠনের মাঞ্জহি-মোড়লদের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি দাঁসায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে যথাযথভাবে উপস্থাপন না করে এমন কাজ করছেন, যার ফলে সাঁওতাল সমাজের ঐতিহ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, দাঁসায়কে কেবল অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে দেখলে তার ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব আড়ালে থেকে যায়। দাঁসায়ের প্রকৃত রীতি, শৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সম্পর্কে যুবসমাজকে সচেতন করাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।

পশ্চিম বর্ধমান মাঞ্জহি মাপাজি মান্ডওয়ার জেলা জকপারানিক রামলাল টুডু বলেন, দাঁসায় সম্পর্কে পূর্বপুরুষেরা নানা লোককথা, গান ও পরম্পরার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়ে এসেছেন। দাঁসায়ের তাৎপর্য শুধু নাচ-গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুবসমাজের ঐক্য, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সামাজিক বন্ধনের বিষয়টিও জড়িত। দাঁসায়ের সময় বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, এলাকার খোঁজখবর নেওয়া এবং তাঁদের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে জানার একটি সামাজিক দিক রয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এই পরম্পরার গভীরতা সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নয়। সেই কারণেই সেমিনারের মাধ্যমে দাঁসায়ের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিনের সেমিনারে উপস্থিত কালিপদ মুর্মু বলেন, আসানসোলের সাঁওতাল যুবসমাজ দাঁসায় সম্পর্কে নতুন করে জানতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে দাঁসায়ের নাম ব্যবহার করে যেখানে-সেখানে অর্থ চাওয়ার প্রবণতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, সাঁওতাল সমাজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে জানা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তার যথাযথ ব্যাখ্যা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সমাজের সকলের। তিনি পশ্চিম বর্ধমান মাঞ্জহি মাপাজি মান্ডওয়াকে এমন একটি সেমিনারের আয়োজন করার জন্য ধন্যবাদ জানান।

সেমিনারের আলোচনায় উঠে আসে, কোনও সমাজের সংস্কৃতি শুধু উৎসবের দিনে প্রদর্শনের বিষয় নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, জীবনবোধ, সামাজিক সম্পর্ক এবং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া শিক্ষা। দাঁসায়ের মতো ঐতিহ্যবাহী ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে যুবক-যুবতীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের ভাষা, গান, লোককথা, পোশাক ও নৃত্যরীতির সঠিক পরিচয় জানতে হবে এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

পাল্টন ধাউড়ার এই সেমিনার তাই নিছক একটি আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ থাকল না। দাঁসায়কে ঘিরে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার, সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা এবং যুবসমাজকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এল এদিনের অনুষ্ঠান থেকে। বক্তাদের বক্তব্য, দাঁসায়ের প্রকৃত ইতিহাস ও পরম্পরা যত বেশি চর্চা হবে, ততই অপব্যাখ্যা ও ভুল ধারণার অবকাশ কমবে। নিজেদের সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সমাজের নিজের হাতেই।

 

দাঁসায়ের ঐতিহ্য রক্ষায় আসানসোলে সেমিনার, অপসংস্কৃতি রুখে যুবসমাজকে শিকড়ের সন্ধান দিলেন মাঞ্জহি মোড়লরা দাঁসায়ের ঐতিহ্য রক্ষায় আসানসোলে সেমিনার, অপসংস্কৃতি রুখে যুবসমাজকে শিকড়ের সন্ধান দিলেন মাঞ্জহি মোড়লরা Reviewed by Social Tribal News Journalist on October 10, 2026 Rating: 5

No comments:

Home Ads

Powered by Blogger.